স্কুল ব্যাগের পরিবর্তে সংসারের বোঝা নিয়ে দিন শুরু হয় শিশু আশিকের

ছোট তিন ভাই বোন আর দাদা-দাদীর মুখে খাবার তুলে দিতেই চায়ের ক্যাটলিতে প্রতিদিনের সকাল শুরু হয় শিশু আশিকের। সমাজের অন্যান্য শিশুদের যখন বাবা-মা আর দাদা-দাদীর আদরের চুমুয় ঘুম ভাঙে ঠিক তখনই আশিকের ঘুম ভাঙাতে হয় চায়ের কাপে চামচের ঝনঝনানি তুলার জন্য। সকাল থেকে রাত অবধি চলে তার এই কর্মযজ্ঞ।

অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন মা, আর পরকীয়া প্রেমিকার সঙ্গে দ্বিতীয় বিয়ে করে চলে গেছেন বাবা। তারপর থেকেই এতিম হয়ে পড়েছে চার শিশু সন্তান। অন্য শিশুদের মতো স্বপ্ন ছিল স্কুলে যাওয়ার অথচ এখন তাকে স্কুল ব্যাগ নয়, তুলে নিতে হয়েছে সংসারের বোঝা।

এই আশিকের দেখা মিলবে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার ধানখোলা ইউনিয়নের কসবা গ্রামের বাজারের ছোট্ট চায়ের দোকানে।

আশিক জানায়, ১০ বছর বয়সে মাকে হারিয়েছি। ১১ বছর বয়স থেকেই বাবাকে হারিয়েছি। তিনি থেকেও নেই। দাদা আছেন, তিনিও এ্যাজমা রোগী। দাদী সালমা খাতুনও অসুস্থ। অপর তিন ভাই-বোন আমার ছোটো। ছোটবোন কুলছুম (৯) প্রথম শ্রেণিতে, ছোটো ভাই মুস্তাকিম (১০) তৃতীয় শ্রেণি ও রিয়াজ (৬) পড়ে শিশু শ্রেণিতে। চতুর্থ শ্রেণিত পর্যন্ত পড়েছি। ছোটো ভাই-বোনের ক্ষুধার জ্বালা মেটাতেই চা কেটলির হাতল ধরেছি।

আশিকের দাদা লালন হোসেন জানান, চা দোকানে প্রতিদিন পাঁচ, সাতশ’ থেকে শুরু হয়ে এক হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয় হয়। খরচ খরচা বাদ দিয়ে দুই তিনশ’ টাকা লাভ থাকে।

যা আয় হয় তা দিয়ে সংসারের খরচ এবং ছোট ভাইবোনের লেখাপড়ার খরচ যোগাতে হিমশিম খেতে হয় আশিকের। কারণ কোনোদিন বিক্রি হয় কম, কোনোদিন মোটামুটি।

ধানখোলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আখের আলী জানান, ঘর নির্মাণ করে দেয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে সহযোগিতা করা হয়েছে পরিবারটিকে।

তিনি আরো বলেন, বাবার নৈতিক নৈতিক চরিত্রের কারনে আজ চারটি সন্তানের এ দুর্দশা। কোনো কোনো দিন সন্তানেরা না খেয়ে থাকে। প্রতিবেশীরা এসব এতিমদের খবর নিলেও বাবা তাদের খোঁজ নেয় না।

আশিকের দাদা লালন হোসেন বলেছেন, গাংনী উপজেলা নির্বাহী অফিসার দিলারা রহমান মাঝে মাঝে আসতেন। শিশুগুলোকে মায়ের স্নেহ দিয়ে কোলে তুলে নিতেন। দোকানটি ভাল করে চালানোর জন্য নগদ টাকা, পোশাক, হাঁড়ি কুড়ি থেকে শুরু করে সব দিয়েছেন।

একটি মাত্র মাটির ঝুপড়ি স্যাঁত স্যাঁতে ঘরে আমরা সবাই মিলে বসবাস করতাম। থাকার জন্য একটি গৃহ নির্মাণ করে

দিয়েছেন। এখন আমরা সেখানেই থাকি। এছাড়া তখনকার ডিসি আতাউল গনি দোকানটি ভাল করে চালানোর জন্য নগদ আট হাজার টাকা দিয়েছেন। এছাড়া কিছু জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠনও করোনাকালিন সময়ে এ পরিবারটির প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আরএম সেলিম শাহনেওয়াজ জানান ওই শিশুগুলোর জন্য সরকারি ভাবে আগামীতেও সব সহযোগিতা দেয়া হবে।

About alamin

Check Also

১৮টি কনসার্ট বাতিল হলেও ভেঙে পড়েননি আঁখি আলমগীর

সংগীতের প্রিয়মুখ তিনি। মিষ্টি করে হাসেন। মিষ্টি সুরে গান করেন। ব্যক্তি মানুষটি আরও চমৎকার। শিল্পীদের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *